আজ ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

পাগলা মসজিদের দানবাক্স যেন টাকার খনি, ৪ মাসে মিললো পৌনে চার কোটিরও বেশি

শফিক কবীর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের আটটি দান বাক্সে ৪ মাস ২ দিনে পাওয়া গেছে পৌনে চার কোটিরও বেশি টাকা। এছাড়াও রয়েছে বিপুল পরিমান স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশি মুদ্রা। আগে এসব অর্থ জেলার অন্যান্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার উন্নয়নসহ গরীব মেধাবী ছাত্রদের জন্য ব্যয় করা হলেও, এবার পাগলা মসজিদকে আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লেক্স বানানোর কাজে ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

শনিবার (১২ মার্চ) সকালে মসজিদের ৮ টি দানবাক্স খুলে বের করা হয় ১৫ বস্তা টাকা। দিনভর গননা শেষে টাকার পরিমান দাঁড়ায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ‌৫৩ হাজার ২৯৫ টাকা। নগদ টাকা ছাড়াও দানবাক্সে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমান স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশি মুদ্রা। এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসের ৬ তারিখে এই আটটি দানবাক্সে পাওয়া গিয়েছিলো ৩ কোটি ৭ লাখ ১৭ হাজার ৫৮৫ টাকাসহ বিপুল পরিমাণ স্বর্নলংকার ও বিদেশি মূদ্রা।

সাধারণত তিন মাস পর পর পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা হয়। কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পর থেকে বিলম্বে দানবাক্স খোলা হচ্ছে।

শনিবার সকাল ৯টার দিকে জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মসজিদের আটটি দানবাক্স খোলা হয়। বাক্সগুলো থেকে টাকা বের করে প্রথমে বস্তায় রাখা হয়। পরে মসজিদের দোতলায় নিয়ে মেঝেতে বসেই শুরু হয় গণনার কাজ।

রূপালী ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও কিশোরগঞ্জ কর্পোরেট শাখার প্রধান মো: রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ওই ব্যাংকের ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকা গণনায় অংশ নেন। তাদেরকে টাকা ভাঁজ করে সহযোগিতা করেন পাগলা মসজিদের অধীনে মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা।

কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাজমুল ইসলাম সরকারের তত্ত্বাবধানে টাকা গণনার কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন জেলা প্রশাসনের ৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। টাকা গণনার কাজ নিজ চোখে দেখতে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ মসজিদে ছুটে যান।

অর্থ গণনায় অংশ নেন পাগলা মসজিদের অধীন এতিমখানার ১২০ জন ছাত্র, পাঁচজন শিক্ষক, ৫০ জন ব্যাংক কর্মকর্তা ও মসজিদ কমিটির ১০ জন সদস্য।

কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে পাগলা মসজিদ অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান। শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মাত্র ১০ শতাংশ ভূমির ওপর এই মসজিদটি গড়ে উঠেছিলো বহু বছর আগে। বর্তমানে এর পরিধি কয়েক একর।

এ মসজিদে সঠিক নিয়তে মানত করলে রোগ-বালাই দূর হওয়া সহ বিভিন্ন মনোবাসনা পূর্ণ হয়। এমন বিশ্বাস থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সকল ধর্মের মানুষ প্রতিনিয়ত মানতের নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, বৈদেশিক মুদ্রা, ছাগল, হাস, মুরগী সহ বিভিন্ন সামগ্রী দান করে থাকেন।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদের সভাপতি মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন,
নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ছাড়া দানের বিভিন্ন সামগ্রী প্রতিদিন নিলামে বিক্রি করে রূপালী ব্যাংকে থাকা মসজিদের একাউন্টে জমা করা হয়। ব্যাংকের লভ্যাংশের টাকা দিয়ে বিভিন্ন জনকল্যাণমুলক কাজ করা হলেও মূল টাকা জমা থাকে।

দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত এ মসজিদটিকে পাগলা মসজিদ ও ইসলামী কমপ্লেক্স হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। এটাকে আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন কমপ্লেক্স নির্মাণ করতে কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, রূপালী ব্যাংকে পাগলা মসজিদের একাউন্টে আজকের গননা করা অর্থ ছাড়াই ইতিমধ্যে ২০ কোটি টাকা জমা আছে।

মসজিদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, ১৯৯৭ সাল থেকে এই মসজিদটি ওয়াকফের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। তখন থেকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মসজিদের সিন্দুক খুলে টাকা গণনা শুরু হয়েছে।

জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় আড়াই’শ বছর আগে পাগলবেশী এক আধ্যাত্মিক পুরুষ খরস্রোতা নরসুন্দা নদীর মধ্যস্থলে মাদুর পেতে ভেসে এসে বর্তমান মসজিদ এলাকা জেলা শহরের হারুয়ায় থামেন। তাকে ঘিরে সেখানে অনেক ভক্তকুল সমবেত হন। ওই পাগলের মৃত্যুর পর সমাধির পাশে এই মসজিদটি গড়ে ওঠে। পরে কালক্রমে এটি পরিচিতি পায় পাগলা মসজিদ নামে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     More News Of This Category