নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনে নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই জটিল হয়ে উঠছে রাজনৈতিক সমীকরণ।
একদিকে অভ্যন্তরীণ দলীয় মতভেদ কাটিয়ে শেষ মুহূর্তে ভিপি সোহেলের ঐক্যে ফুরফুরে ভাব বিএনপির, অন্যদিকে নির্বাচনী মাঠে ধীরে ধীরে দলীয় কোনঠাসায় একা হয়ে পড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম খান চুন্নু, আরেক দিকে জামায়াত-সমর্থিত ১১ দলীয় জোটে দুই শরিকের কোন্দল আরো ঘনীভূত হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে আসনটিতে ত্রিমুখী লড়াই ভাবলেও ভোটের অঙ্কে রয়েছে কিছুটা অস্পষ্টতা।
শুরুতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো.মাজহারুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়ার পর মাজহারুল ইসলামের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা পর্যায়ের শীর্ষ পাঁচ নেতা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন ও বিক্ষোভ প্রকাশ করেন।তার চরিত্র ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দলের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ছিল। মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে সভা-সমাবেশ, মশাল মিছিল, মানববন্ধন কর্মসূচিও পালিত হয়। এতে দলের ভীতরে বাহিরে বিভক্তির চিত্র প্রকাশ পায়।
তবে নির্বাচনের একেবারে কাছাকাছি সময়ে বিভাজন ভূলে একে একে ধানের শীষের ছায়াতলে এসে সেই বিভাজন অনেকটাই চাপা পড়ে। বিশেষ করে গত ৪ ফেব্রুয়ারি সদরের রশিদাবাদে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী পথসভায় মনোনয়ন প্রত্যাশী হেভিওয়েট প্রার্থী খালেদ সাইফুল্লাহ ভিপি সোহেল এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন ঐক্যবদ্ধ বিএনপি, তাতে জেলার স্থানীয় ও তৃনমুলের নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচনী কাজ করার আহ্বান জানান। এতে করে ধানের শীষের নেতাকর্মীদের মাঝে অনেকটাই ফুরফুরে ভাব বিরাজ করছে।

জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি সাঈদ সুমন বলেন, দলের মূল স্লোগান ব্যক্তির চেয়ে দল বড় – দলের চেয়ে দেশ বড়, আমরা স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম খান চুন্নু ভাইয়ের অনুসারী হয়ে উনার মনোনয়ন প্রত্যাশায় বিভক্তি হয়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়েছি। দল উনাকে বহিষ্কার করায় আমরা দলের ঐক্যে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছি, আমরাতো দল ছেড়ে কোন ব্যক্তির পক্ষে যেতে পারি না।

পৌর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, শুরুতে মনোনয়ন প্রত্যাশায় দলের মধ্যে যে বিভক্তি বা ফাটল দেখা দিয়েছিল তাতে দলীয় প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনার পথে কিছুটা ব্যাঘাত বা অন্ধকার অবস্থায় ছিলো। কিন্তু জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় সকল ভেদাভেদ ভুলে বিভক্তি ছেড়ে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সকল অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দের যে ঐক্য ধানের শীষের পক্ষে মাঠে রয়েছে এতে করে বিএনপিতে বইছে বিজয়ের সুবাতাস আর নেতাকর্মীরাও অনেকটা ফুরফুরে বলা যায়, আমাদের আর কোন বাধা নেই ইনশাআল্লাহ বিপুল ভোটের ব্যাবধানে আমাদের জয় নিশ্চিত।
বহিস্কৃত জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি, স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম খান চুন্নু এই আসনের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তিনি একাধিক বার বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন এবং ঢাকা বিভাগীয় সাবেক স্পেশাল জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। নির্বাচনের শুরুতে জেলা বিএনপির শীর্ষ পাঁচ নেতা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন সংগ্রামে একসাথে থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চুন্নুর সমর্থনে সেই আন্দোলনে ফাটল ধরে। কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ কেউ নীরবে সরে দাঁড়ান। নির্বাচনের কাছাকাছি এসে চুন্নু কার্যত রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন। তবুও তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও অতীত পরিচিতিকে ভর করে তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
জোট দলীয় ঐক্যের সিন্ধান্তে শক্তিশালী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই আসনটি ছেড়ে দিলেও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের শরিকদের মধ্যে চুড়ান্ত হয়নি সমঝোতা। খেলাফতে মজলিস (দেওয়াল ঘড়ি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা) নিয়ে শুরু থেকেই চালিয়ে যাচ্ছে প্রচার-প্রচারনা। এই দুই দলের প্রার্থী ও রাজনৈতিক কোন্দলের ফলে ইসলামপন্থী ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভোটারদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। কার পক্ষে ভোট দিলে জোটের অবস্থান শক্তিশালী হবে সে প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পাচ্ছেন না অনেকেই। যদিও ৫ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জে নির্বাচনী জনসভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক ঘোষণা করেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের ১১ দলীয় জোটের মনোনীত একমাত্র প্রার্থী মুফতী মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ হাদী। এর কিছুক্ষণ পরেই খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী এক ভিডিও বার্তায় এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তার শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরেন।
সব মিলিয়ে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে ভোটের সমীকরণ এখনো অনিশ্চিত। বিএনপির ঘোষিত ঐক্য কতটা বাস্তব রূপ পায়, খেলাফতী দলগুলোর কোন্দল কতটা ভোটে প্রভাব ফেলে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী চুন্নু কতটা ব্যক্তিগত ভোট টানতে পারেন এই তিনটি বিষয়ই ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
Leave a Reply