আজ ১৭ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১লা জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

“জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগ” মাধবদীর নওপাড়ায় মসজিদের ভেতরে হাটু পানি

মোঃ আল আমিন, মাধবদী (নরসিংদী) সংবাদদাতা ঃ
“নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে/ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষার বন্দনা করে এমন অমর পঙক্তি রচনা করেছিলেন। বর্ষাকে স্বাগত জানিয়ে বন্দনা করে এমন আরো অনেকে অসংখ্য কবিতা ও গানে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্ষাকালে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। পাশাপাশি বৃষ্টির সৌন্দর্য মানুষের মনে শিল্পবোধ জাগিয়ে তুলবে। কবি কবিতা লিখবেন, সুরকার সুর বাঁধবেন, গায়ক গান গাইবেন, চিত্রশিল্পী ছবি আঁকবেন- আর এভাবে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি আরো ঋদ্ধ হয়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এমন সৌন্দর্য উপভোগ তো দূরের কথা, প্রত্যাশা করাও যেন বেশ দুষ্কর হয়ে গেছে মাধবদী থানার নূরালাপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামবাসীর জন্য। কংক্রিটে আচ্ছাদিত নওপাড়া থেকে প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ বহু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। নওপাড়া গ্রামের ঐতিয্যবাহি বায়তুর রহমান জামে (কুয়েতি) মসজিদ ও মাদরাসাতুর রহমান হিফজুল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা সহ অনেক বাড়ি ঘরই বৃস্টির পানিতে তলিয়ে আছে। গত এক সপ্তাহের বেশী সময় ধরে বন্ধ হয়ে গেছে নওপাড়া বায়তুর রহমান জামে (কুয়েতি) মসজিদের নামাজের ব্যবস্থা। মসজিদের ভেতরে এখন হাটু সমান পানির সাথে বসবাস করছে পোকা মাকর, মাছ ও ড্রেনর ময়লা পানি। পরিস্থিতি সামাল দিতে মসজিদের চারদিকে বালুর বাঁধ দিয়েও কোন কাজে আসেনি। মসজিদটিকে শেষ রক্ষা করতে পারেনি এলাকার সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় মুসল্লিরা। মসজিদটিতে নওপাড়া ও ভগিরথপুর দু’টি গ্রামের প্রায় শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে আসতো। মসজিদটির পাশেই রয়েছে ছোট বড় দু’টি গোরস্থান যা বর্তমান সময়ে পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এলাকার কোন ব্যক্তি মৃত্যু বরন করলে এ গোরস্থানে দাফন করার মতো কোন ব্যবস্থা নেই। মরদেহটি নিয়ে দাফন করতে হয় অন্যকোন এলাকার কবরস্থানে। এ গ্রামের ছোট রাস্তার পাশাপাশি অলিগলির অবস্থা আরো করুন। বেশির ভাগ বাড়ির আঙিনা সহ কারো কারো বাড়ির নিচতলায়ও পানি ডুকেছে। স্থানীয় ছোট খাট ব্যবসারও হচ্ছে বেশ ক্ষতি। জলাবদ্ধতার কারণে কোমলমতী শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে। নওপাড়া একটি আদর্শ গ্রামে এ গ্রামে রয়েছে বেশ ক’টি মাদ্রাসা, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন, গালর্স হাই স্কুল ও একটি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে কুয়েতী মসজিদের পাশে অবস্থিত মাদরাসাতুর রহমান হিফজুল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসাটির ভেতরের প্রতিটি কক্ষেও পানিতে তলিয়ে রয়েছে উপায়ান্তু না দেখে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে বন্ধ ঘোষনা করতে বাধ্য হয়েছেন কতৃপক্ষ। পাশাপাশি অফিসগামী ও ব্যবসায়ী মানুষদের ভোগান্তিও চরমে। দিনদিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে নওপাড়া আদর্শ গ্রামের জলাবদ্ধতার চিত্র৷ সামান্য বৃষ্টিপাতেই এই গ্রামের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তলিয়ে আছে পানিতে৷ বর্ষায় পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরো ভয়াবহ৷ নওপাড়ার জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকাকেই দোষছেন স্থানীয়রা। জলাবদ্ধতার এই জনদুর্ভোগ থেকে যেন গ্রামবাসীরা কোনোভাবেই মুক্তি পাচ্ছে না। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা গ্রামটিতে এখন প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস করছে৷ এই গ্রামের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে বা এখনো গড়ে উঠছে অপরিকল্পিতভাবে৷ ফলে নওপাড়া গ্রামের বেশির ভাগ পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় পুরো গ্রামজুড়ে।
নওপাড়া বায়তুর রহমান জামে (কুয়েতি) মসজিদ ও মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রবাসী হাজী জাহাঙ্গীর আলম নান্নু বলেন, এ জলাবদ্ধতা কোন ভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। এখানে নেই পানি নিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা। মসজিদে ভেতরে পানি ঢুকে মুসল্লিদের জামাতে নামাজ আদায় করা বন্ধ হয়েগেছে। এখন যার যার বাড়িতে নামাজ আদায় করছে। আমি বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়েও এর কোন সুষ্ঠ সমাধান খুজে পাচ্ছি না। মসজিদের চারদিকে বালুর বাঁধ দিয়েও কোন কাজে আসছেনা। বালুর বাঁধ ভেঙে মসজিদে ডুকে পরছে পানি। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন যত দ্রুত সম্ভব পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিন গ্রামবাসীদের। সাধারনদের মন খুলে ইবাদত করার সুযোগ করে দিন। তিনি গনমাধ্যম কর্মীদের উদ্দ্যশে বলেন আপনাদের লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরুন নওপাড়া গ্রামবাসীর দুঃখ ও দুরদর্শার চিত্র।
অন্যদিকে নূরালাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খাদেমুল ইসলাম ফয়সালের সাথে এ ব্যাপারে কথা বললে তিনি বলেন, আমি সরেজমিনে দেখেছি। নওপাড়াবাসী দূর্ভোগ লাগবের জন্যই আমি ভবিষৎ পরিকল্পনা করে একটু উচু করে ড্রেনেজের ব্যবস্থা করে আধুনিক সড়ক তৈরী করেছি। সড়কটির আশপাশের জমি ও বাড়ি ঘরের থেকে উচু হওয়ায় এই সমস্যা হয়েছে। আমি আপ্রাণ চেস্টা করছি এর একটি সুষ্ঠু সমাধান করার জন্য। ইতোমধ্যেই আমরা পরিকল্পনা করেছি সড়কের পূর্ব পাশের পানিগুলো ছোট ড্রেনের মাধ্যমে পশ্চিম পাশের ড্রেনে নিয়ে সংযোগ করে দেয়ার তাতে অস্থায়ী ভাবে জলাবদ্ধতা কমবে। বর্ষা শেষে সুদিনে স্থায়ী ভাবে এর ব্যবস্থা করবো ইনশাল্লাহ। এবং মসজিদের মাঠের জন্য বালু দেয়ার ব্যবস্থা করছি। নওপাড়া একটি আর্দশ গ্রাম এ গ্রামের একজন জনগনকেও কস্ট করতে দিবো না ইনশাল্লাহ। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী চেস্টা করে যাবো যেন নওপাড়াবাসী সুখে থাকতে পারে। এসময় উপস্থিত স্থানীয় জনগন জানায় ইউপি চেয়ারম্যান ফয়সল আমাদের দুঃখ দুরদশা লাগবের জন্য অনেক চেস্টা করছেন।
আপরদিকে নওপাড়া বায়তুর রহমান জামে (কুয়েতি) মসজিদের মুসল্লি মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকায় এই জলাবদ্ধতার সৃস্টি হয়েছে। বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টি হলেই মসজিদ ও মাদ্রাসার মাঠে জলাবদ্ধতা লেগেই থাকে। ফলে স্থানীয় মুসল্লি ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি দেখা দেয়। আমরা এই ঐতিয্যবাহি পুরাতন কুয়েতী মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজ আদায় করতাম গত এক সপ্তাহ যাবৎ মসজিদে এসে নামাজ পড়তে পারছিনা।
এদিকে বর্ষা ও বৃস্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য সেই আধিকাল থেকেই নওপাড়া ও ভগিরথপুর সিমান্ত এলাকায় নাহিরাজ নামে একটি বিশাল জলাধার ছিলো যার কিছু দুর পেছনে ছিলো একটি খাল ভগিরথপুর সিরার বাড়ির যান নামক একটি বিশাল ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতো। জলাধার নাহিরাজ, খাল আর পানি প্রবাহের যান এসব ক্রমান্বয়ে ভরাট করে ফেলেছে এক শ্রেণির প্রভাবশালীরা। আর তাই বিশাল জনসংখ্যার এ গ্রামগুলোর পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একসময় নওপাড়া গ্রাম সহ আশপাশের বেশ কয়কটি উচু গ্রামের পানি নিষ্কাশনে বিশেষ ভূমিকা রাখতো এসব জলাধারগুলো। কিন্তু এই খালগুলো এখন খুঁজে পাওয়াও কঠিন৷ বেশিরভাগই চলে গেছে দখলদারদের হাতে। এলাকার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট করে ফেলায় পানি নিষ্কাশনের পথ রূদ্ধ হয়েছে। অতিদ্রুত নওপাড়ার জলাবদ্ধতা নিরসনে টেকসই উদ্যোগ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এরই ধারাবাহিকতায় অতিদ্রুত সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও টেকসই ড্রেনেজ ও জল নিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। আর এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি নূরালাপুর ইউপি’র জনপ্রতিনিধিদেরকে করতে হবে জরুরী ভিত্তিতে জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, স্থানীয় সমস্যাগুলো নিরসনে কার্যকর ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ। তাহলে অনেকাংশেই পরিকল্পিত নগর গঠনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেয়া সম্ভব হবে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     More News Of This Category